ডেস্ক রিপোর্ট: ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়’—এমন কথা প্রায়ই শোনা যায় ইউরোপের নানা দেশে নানা আলোচনায়, তবে তা ইউরোপীয় নেতাদের মুখ থেকে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনীতিকেরা যেমন রাখঢাক না রেখেই ইউরোপের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ কথা বলছে, ইউরোপীয় রাজনীতিতে মার্কিনদের বিরুদ্ধে তেমনভাবে কথা বলার সংস্কৃতি বা রেওয়াজ নেই বললেই চলে। তবে সময়ের ব্যবধানে সবকিছু পাল্টাচ্ছে।
এবার সেই সাদা সত্য কথাটি বললেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস। তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকাটির সঙ্গে ১৩ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়।’ এ শিরোনামে ইউরোপের একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবরটি এসেছে।
কাজা কালাস বলেছেন, ‘আমরা ইউরোপীয়রা একসঙ্গে থাকলে মার্কিনরা তা পছন্দ করে না। কারণ, একসঙ্গে থাকলে আমরা তাদের মতো সমান শক্তিশালী। বহু দশক ধরে আমাদের অংশীদারিপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। তারপরও আমাদের সম্পর্কটি এখন অত্যন্ত জটিল।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই শীর্ষ কূটনীতিক গত ডিসেম্বর ও গত জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত দুটি নীতিগত নথির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সেখানে তাঁদের জাতীয় নিরাপত্তাকৌশল ও জাতীয় প্রতিরক্ষাকৌশলের বিষয়গুলো পড়ে দেখেন, তাহলে আমার মতামতের সঙ্গে কেউ দ্বিমত প্রকাশ করবে না। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে তারা ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পছন্দ করে না। কাজা কালাস বলেন, ‘ওয়াশিংটনের এই আচরণ আমাদের প্রতিপক্ষদের কৌশলের কথাই মনে করিয়ে দেয়।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এবার এই যুদ্ধ হচ্ছে ইউরোপকে ছাড়াই। ইরানের বিরুদ্ধে এবারের এই যুদ্ধ গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম বড় যুদ্ধ, যা যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই পরিচালনা করছে। বলকান অঞ্চলে হস্তক্ষেপ, আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় সামরিক অভিযান, এমনকি তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট’-এর বিরুদ্ধে জোট—এসবই ছিল মার্কিন সামরিক কার্যক্রম, যা ন্যাটোর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে, অথবা যেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো পৃথকভাবে অংশ নিয়েছিল। অথচ এবারের যুদ্ধে ইউরোপের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সায় ছিল না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের সম্পর্কের এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ব্রিটেনের ক্ষেত্রে, যে দেশটি সব সময় আমেরিকার সঙ্গে তাদের তথাকথিত বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে গর্ব করত। এমনকি বিতর্কিত ইরাক যুদ্ধেও ২০০৩ সালে ব্রিটিশরা মার্কিনদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল। অথচ এবার ব্রিটিশ সরকার প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর হামলার জন্য তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকার করেছিল। পরে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিলেও সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি।
শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস বলেছেন, ‘প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আমাদের নির্ভরতা রয়েছে। কারণ, আমেরিকা থেকে আমাদের অস্ত্র কিনতে হয়।’ এ ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিরক্ষাশিল্পেও বিনিয়োগ করার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনের প্রথম দিনই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেমস ডেভিড ‘জেডি’ ভ্যান্স ইউরোপের বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধমূলক ভাষণ দেন। তাঁর কথায়, ইউরোপের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোকে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। ১৮ মিনিটের ভাষণে ভ্যান্স ইউরোপের সরকারগুলো যে পথ নিয়েছে, তিনি তার সমালোচনা করেন।
ভ্যান্স সেই সময় অভিযোগ করে বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলো নাকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ করছে। আমি আশঙ্কা করি, যুক্তরাজ্য ও সমগ্র ইউরোপে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পশ্চাদপসরণ করছে।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত সেন্সরশিপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন মনে হয়, অনেক সরকার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে নিজেদের নাগরিকদের মতামত দমন করছে।’
কয়েক বছর আগেও যা অকল্পনীয় ভাবা হতো, তা করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর। তিনি ঘোষণা করেন, ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মান পত্রপত্রিকাগুলো লিখেছিল, নিরাপত্তা সম্মেলনে জার্মান চ্যান্সেলর যেন হঠাৎই একটি রাজনৈতিক বোমা ফাটালেন। যদিও আগে থেকেই জানা ছিল যে ফরাসি ও জার্মান নেতারা গোপন বৈঠকে একটি যৌথ পারমাণবিক পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা করছেন। তবে তার সরকারি স্বীকৃতি ততটা পাওয়া যেত না। কিন্তু মিউনিখে চ্যান্সেলরের বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করার পেছনে একটি নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। চ্যান্সেলর মেরৎস মূলত বলতে চেয়েছেন, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব বা বন্ধুত্ব ছিন্ন করতে চায় না, কিন্তু ইউরোপ শক্তি ও নিরাপত্তার রাজনীতিতে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল হতে চায়।
মার্কিন-ইউরোপ সম্পর্ক ক্রমশই উত্তপ্ত হচ্ছে। ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়’—এই কথা ক্রমশই ইউরোপীয় জনগণের মনে চাউর হচ্ছে। এখন তা প্রকাশ পাচ্ছে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মুখ থেকেও।
প্রিন্ট করুন



















Discussion about this post