ডেস্ক রিপোর্ট: মধ্যপ্রাচ্যে যাক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের রেশ থেকে কোনোভাবেই নিজেদের দূরে রাখতে পারছে না সৌদি আরব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকেই রিয়াদ চেষ্টা করে আসছিল যে কোনো ভাবে এই যুদ্ধের বাইরে থাকতে। কিন্তু তিন দিক থেকে একের পর এক আক্রমণের শিকার হয়ে অবশেষে নীরবতা ভাঙতে বাধ্য হয়েছে দেশটি।
সম্প্রতি ইরাকে অবস্থিত ইরান সমর্থিত আধা-সামরিক বাহিনীর ওপর মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি প্রশাসনের দাবি, এই গোষ্ঠীটিই সম্প্রতি রাজতন্ত্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এই সামরিক পদক্ষেপের পরও রিয়াদের সামনে এখন কঠিন সমীকরণ ঝুলছে, তারা কি প্রতিপক্ষকে দমাতে এই পালটা আক্রমণ অব্যাহত রাখবে, নাকি অপ্রকাশ্য অর্থ লেনদেন বা আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার পুরোনো কৌশলে ফিরে যাবে।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি সুনির্দিষ্ট শিবির। একদিকে রয়েছে ইরান, তাদের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের মতো আঞ্চলিক মিত্ররা। অন্যদিকে রয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও জর্ডান। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও এই মুহূর্তে তারা এ সংঘর্ষে দৃশ্যমান সক্রিয় অংশীদার নয়।
সম্প্রতি ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে জর্ডান, কুয়েত এবং বাহরাইনকে। সেই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথিদের নতুন করে এই যুদ্ধে যুক্ত হওয়া। ইরান ও মার্কিন জোটের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমঝোতা না হওয়ায় পুরো অঞ্চলটি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সর্বগ্রাসী যুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছে।
সৌদি আরবের এই নিরাপত্তার সংকট নতুন নয়। ২০১৯ সালে তাদের অন্যতম প্রধান দুটি তেল শোধনাগার আবকাইক ও খুরাইসে ড্রোন হামলায় রিয়াদ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল। সেই হামলায় তাদের প্রতিদিনের তেল রপ্তানি রাতারাতি অর্ধেকে নেমে আসে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতি সম্প্রতি আবকাইক তেল কেন্দ্রে ইরাক ভিত্তিক পরা সামরিক গোষ্ঠীগুলো আবারও নতুন করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু টার্মিনালে তেল পাঠাচ্ছিল রপ্তানির পথ সুগম রাখতে। কিন্তু গত জুলাই মাসে ইয়েমেনি সরকারের সমর্থনে সৌদি আরব সানা বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালানোর পর হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহণ আবার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
দীর্ঘ সাত বছর ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালিয়েও হুথিদের দমন করতে পারেনি রিয়াদ। বরং ২০২২ সালে এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাদের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে যেতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে উত্তর দিক থেকে ইরাকি বাহিনীর আক্রমণ এবং দক্ষিণ থেকে হুথিদের সক্রিয় প্রতিরোধী অবস্থান সৌদি আরবকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর সৌদি আরব তাই এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, তারা কি মার্কিন জোটের অংশ হয়ে ইরান বলয়ের সঙ্গে সামরিক শক্তিক্ষয়ে নামবে, নাকি নিজের বিশাল পরিকাঠামো বাঁচাতে নতুন কোনো আপস বা কৌশলের পথ খুঁজবে।
খবর : বিবিসি
প্রিন্ট করুন




















Discussion about this post