ডেস্ক রিপোর্ট: ভূকম্পনপ্রবণ জাপানে কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজধানী টোকিও অচল হয়ে পড়লে যাতে সরকার পরিচালনা ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে একটি বিকল্প (দ্বিতীয়) রাজধানী নির্ধারণের জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করেছে দেশটির আইনপ্রণেতারা।
জুলাই মাসে পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদিত হয়। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা ঘিরে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।
সমালোচকদের দাবি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জোট সরকারের ছোট শরিক ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’র প্রভাববলয় ওসাকাকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিকল্প রাজধানী নিয়ে পার্লামেন্টে দীর্ঘ বিতর্কের কারণে আইনপ্রণেতাদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি পিছিয়ে যায়। নিম্নকক্ষে ক্ষমতাসীন জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি সহজে পাস হলেও, বিরোধী নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষে তা সামান্য ব্যবধানে অনুমোদিত হয়। ফলে আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির অন্যান্য নীতি বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
কেন বিকল্প রাজধানীর এই উদ্যোগ?
নতুন এই আইনের মূল দর্শন হলো টোকিওতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলেও যেন সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ মাত্রার বা তার চেয়ে বড় ধরনের একটি মারাত্মক ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ।
এমন কোনো বড় দুর্যোগ ঘটলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট, কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বিপর্যস্ত হতে পারে। আইন অনুযায়ী, ওই পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে নির্দিষ্ট অঞ্চল সাময়িকভাবে দেশের মূল রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি ছাড়াও, বিকল্প অঞ্চলগুলোকে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে জাপানের মোট অর্থনীতির প্রায় পাঁচভাগের একভাগ টোকিও থেকে আসে, দেশের অর্ধেকের বেশি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এখানে অবস্থিত এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ এই এক অঞ্চলে বসবাস করে।
অর্থনৈতিক ও জনমিতিক এই ‘এককেন্দ্রিকতা’ কাটাতে বিকল্প রাজধানী এলাকাগুলোতে সরকারি স্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি, কর ছাড় এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণীয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিতর্ক কেন?
জাপানের দ্বিতীয় রাজধানী গঠনের পরিকল্পনাটি মূলত ওসাকাকেন্দ্রিক দল ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’র (যা ‘ইশিন’ নামে পরিচিত) একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এজেন্ডা। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও ওসাকার সাবেক গভর্নর তোরু হাশিমোতো ২০১০ সালের দিকে প্রথম ওসাকাকে বিকল্প রাজধানী করার প্রস্তাব দেন।
গত বছর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে দীর্ঘদিনের শরিক কোমেইতোর জোট ভেঙে যাওয়ার পর, ‘ইশিন’ দলকে জোটে আনতে তাকাইচি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলেন, তার মধ্যে বিকল্প রাজধানী বিল পাস অন্যতম। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে বঞ্চিত করে বিপুল অর্থ, কর ছাড় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন কেবল ওসাকা বা কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকেই পরিচালিত হতে পারে।
এ ছাড়া, সরকার এখনো এই বিকল্প রাজধানী বাস্তবায়নের সম্ভাব্য খরচ বা অর্থনৈতিক সুবিধার কোনো স্পষ্ট হিসাব দিতে পারেনি। অন্যদিকে, ওসাকা শহরের প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে স্থানীয় রাজনীতির জটও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
কোন শহরগুলো দৌড়ে এগিয়ে?
আইনে নির্দিষ্ট করে ওসাকা বা অন্য কোনো শহরের নাম উল্লেখ করা হয়নি; বরং এটি একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছে যার অধীনে অঞ্চলগুলো আবেদন করতে পারবে। এমনকি একের অধিক বিকল্প রাজধানী করার পথও খোলা রাখা হয়েছে। শহর নির্বাচনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বিকল্প রাজধানী হওয়ার জন্য কোনো অঞ্চলকে টোকিওর একই সময়ে দুর্যোগকবলিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে তুলনামূলক মুক্ত হতে হবে। পাশাপাশি সেখানে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক সক্ষমতা, সরকারি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং জনসংখ্যা থাকতে হবে।
ইতোমধ্যেই ফুকুওকা, হোক্কাইদো এবং মিয়াগির মতো কয়েকটি প্রিফেকচার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটার কেন্দ্রস্থল আইচির গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা বিল পাসের পরপরই ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তার অঞ্চলকে দেশের প্রথম বিকল্প রাজধানী হিসেবে দেখতে চান।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিকল্প রাজধানী বিল পাস করে তাকাইচি তার জোটসঙ্গী ‘ইশিন’ দলকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে পারলেও, উচ্চকক্ষে মাত্র দুই ভোটের ব্যবধানে বিলটি পাস হওয়া তার সরকারের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো জরুরি বিষয়গুলোর সমাধান না করে এসব বিতর্কিত আইন বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়ায় ভোটারদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জনপ্রিয়তা কমছে। একই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যে বিক্রয় কর কমানোর যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নীতি নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে সমালোচনা তৈরি হচ্ছে।
খবর : হিন্দুস্তান টাইমস
প্রিন্ট করুন




















Discussion about this post