ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশে বিগত সরকারের একটি বিশেষ সময়ে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের যে রেকর্ড দেখা গিয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তাতে হঠাৎ ভাটার টান। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার কমছে, আর অন্যদিকে আবারও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে অবৈধ ‘হুন্ডি’ নেটওয়ার্ক। কিন্তু প্রশ্ন হলো— হুট করে কেন প্রবাসীরা আবার হুন্ডির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন? ব্যাংকিং চ্যানেলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড পরিমাণ টাকা পাঠিয়েছিলেন। কারণ তখন সরকারিভাবে আড়াই শতাংশ (২.৫%) প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছিল, ব্যাংকের ডলার রেট ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কিছু প্রশাসনিক কড়াকড়ি দেখা গিয়েছিল। এতে প্রবাসী ভাই-বোনেরা অনুভব করেছিলেন যে, কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে পাঠালেই দেশের কল্যাণ, আর লাভও বেশি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ব্যাংকিং চ্যানেল ছেড়ে প্রবাসীদের একটি বড় অংশ আবারও হুন্ডির দিকে ঝুঁকছেন। মূলত ৫টি প্রধান কারণে এটি ঘটছে:
দামের বড় ব্যবধান :
ব্যাংক যেখানে প্রতি ডলারে একটি নির্দিষ্ট অফিসিয়াল রেট দিচ্ছে, হুন্ডি বা খোলা বাজারে প্রতি ডলারে মিলছে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেশি। আয়ের হিসাব মিলাতে গিয়ে প্রবাসীরা এই বাড়তি টাকাটা হাতছাড়া করতে চান না।
ঝামেলাহীন ও দ্রুত সেবা:
ব্যাংকে টাকা পাঠাতে কাগজপত্র পূরণ, আইডির ফটোকপি আর লাইনে দাঁড়ানোর ঝক্কি রয়েছে। অন্যদিকে হুন্ডিতে একটি মেসেজ বা ফোন কলেই টাকা পৌঁছায় প্রবাসীর স্বজনের হাতে, তা-ও আবার কোনো সার্ভিস চার্জ ছাড়াই।
সীমান্ত ও বাণিজ্য কারসাজি:
ব্যবসায়িক কাজে ওভার-ইনভয়েসিং বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের জন্য হুন্ডি চক্রের বিশাল অংকের টাকার চাহিদা থাকে। ফলে হুন্ডি কারবারিরা প্রবাসীদের কাছ থেকে চড়া দামে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নেয়।
অফিসিয়াল প্রণোদনার আকর্ষণ হ্রাস:
বর্তমানে ব্যাংকিং প্রণোদনার হার এবং ব্যাংকের বিনিময় হার একসাথে মিলেও খোলা বাজারের হারের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না।
ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার সংকট:
ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং বিভিন্ন অনিয়মের খবরের কারণে অনেক প্রবাসী মনে করছেন ব্যাংকের চেয়ে দ্রুত হাতে হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়াই নিরাপদ।
কিন্তু প্রবাসীদের মনে রাখা জরুরি— তাত্ক্ষণিক কিছু বাড়তি টাকার জন্য হুন্ডি বেছে নেওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ:
জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত: হুন্ডির টাকা দেশের মূল অর্থনীতি বা রিজার্ভে যুক্ত হয় না। ফলে দেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটে।
আইনি ঝুঁকি: হুন্ডি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটি মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচারের অংশ।
প্রতারণার ভয়: হুন্ডি প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি দলিল বা রসিদ থাকে না। মধ্যস্বত্বভোগী টাকা নিয়ে গায়েব হয়ে গেলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ আবার বৈধ পথে ফেরাতে হলে কেবল প্রবাসীদের ওপর দায় না চাপিয়ে নীতিগত পরিবর্তন আনা জরুরি:
বাজারভিত্তিক ডলার রেট: ব্যাংক ও খোলা বাজারের ডলার রেটের ব্যবধান যথাসম্ভব কমিয়ে আনা।
সহজ ব্যাংকিং প্রক্রিয়া: রেমিট্যান্স অ্যাপস এবং এনএফসি/ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সহজ করা যাতে প্রবাসীরা ঘর বসেই টাকা পাঠাতে পারেন।
বাড়তি প্রণোদনা ও সম্মাননা: বৈধ পথে টাকা পাঠানো প্রবাসীদের জন্য এয়ারপোর্টে বিশেষ সুবিধা, পেনশন স্কিম এবং স্মার্ট প্রণোদনা নিশ্চিত করা।
প্রবাসী ভাই-বোনদের রক্তঘামে অর্জিত প্রতিটি সেন্ট আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আপনাদের সামান্য সচেতনতা এবং সরকারের সঠিক ও বাস্তবসম্মত নীতিই পারে হুন্ডির এই কালো ছায়াকে দূর করে দেশকে আবার অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে।
“বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠান, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করুন।
প্রিন্ট করুন



















Discussion about this post