ডেস্ক রিপোর্ট: ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির জন্ম হয়েছিল… যারা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টি’র ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান আর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছিল—সেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ দাঁড়িয়ে আছে তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকটে। টানা দেড় দশকের বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর, ২০২৬ সালের এই জুনে এসে দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায়। ক্ষমতার বাইরে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দলটির দেড় দশকের অপশাসন এবং বিতর্কিত নির্বাচনের খতিয়ান জনসমক্ষে চলে আসে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দল ও এর ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ হওয়ার পর, আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন পুরোপুরি ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমনির্ভর। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থাকা নেতাদের ডাকে কিছু ঝটিকা মিছিল হলেও, তা সরকারকে বড় কোনো চাপে ফেলতে পারেনি। উল্টো ঢাকার রাস্তায় ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতিই বলে দেয়—পরিস্থিতি কতটা থমথমে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটির সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া জনসমর্থন ফিরিয়ে আনা। আওয়ামী লীগের গত চার দশকের ইতিহাস মূলত শেখ হাসিনারই ইতিহাস। ১৯৮১ সালে বিভক্ত ও নেতৃত্বসংকটে ভোগা দলের হাল ধরেছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফেরে দল, আর ২০০৮ এর পর টানা ১৫ বছর দেশ শাসন করে।
কিন্তু এই অতি-কেন্দ্রিক নেতানির্ভরতাই আজ দলটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক কেন্দ্রবিন্দু শেখ হাসিনা হওয়ায়, তাঁর অনুপস্থিতিতে পুরো দল আজ কার্যত নেতৃত্বশূন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি ক্ষমতা হারানোর পর এভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতারা আজ হয় কারাগারে, না হয় আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে। ইতিহাস সব সময় কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পদ থাকে না। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল। দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রজেক্ট।
কিন্তু একই সাথে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন দলটির রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভিন্নমত দমন, গুম ও অপশাসনের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪-এর জুলাইয়ে, যা দলটিকে এক আগ্রাসী ও কর্তৃত্ববাদী শক্তি হিসেবে দাঁড় করায় জনগণের মুখোমুখি। কোটি কোটি সমর্থক ও সাংগঠনিক শক্তির যে বড়াই দলটি করতো, ক্ষমতার ছাতা সরে যেতেই তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের সামনে এখন পথ কয়টি? রাজনীতি-বিশ্লেষকেরা মূলত চারটি সম্ভাব্য পথের কথা বলছেন:
প্রথম পথ: দীর্ঘস্থায়ী কোণঠাসা অবস্থা। আইনি জটিলতা ও মামলার বেড়াজালে দলটির পুনর্গঠন বহু বছর ঝুলে থাকা।
দ্বিতীয় পথ: অভ্যন্তরীণ সংস্কার। শেখ হাসিনানির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনা এবং অতীতের ভুলের জন্য প্রকাশ্যে আত্মসমালোচনা করা।
তৃতীয় পথ: বিভাজন বা ভাঙন। অতীতেও আওয়ামী লীগ ভেঙেছে, এই চরম সংকটে নেতৃত্ব সংকটের জেরে দলটির আবার খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চতুর্থ পথ: রাজপথের সুযোগ খোঁজা। অর্থাৎ, বর্তমান সরকারের কোনো বড় ভুল বা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ফাটলের সুযোগ নিয়ে আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করা। আপাতদৃষ্টিতে দলটির বর্তমান ভার্চ্যুয়াল নেতৃত্ব এই পথেই হাঁটছে।
৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই দলটির অতীতের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়গুলো আজ ঢাকা পড়ে গেছে সাম্প্রতিক অতীতের কলঙ্কিত অধ্যায়ে। আওয়ামী লীগ কি পারবে নিজেদের ভুল স্বীকার করে, সংস্কারের পথ ধরে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঘুরে দাঁড়াতে? নাকি অতীতের স্মৃতির ওপর ভর করে দীর্ঘ এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে হারিয়ে যাবে—তা সময়ই বলে দেবে।
প্রিন্ট করুন



















Discussion about this post