ডেস্ক রিপোর্ট: ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর দখলের গতি বাড়িয়েছে ইসরাইল, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চলতি মাসের শুরুতে ইসরাইলি মন্ত্রীরা দখলের যে পরিকল্পনার আভাস দিয়েছিলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তার বাস্তবায়নের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় প্রতিবেদনে উলেখ করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ইসরাইলের জ্বালানি ও অবকাঠামোমন্ত্রী এলি কোহেন স্পষ্ট করে বলেছেন, গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো গাজা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এদিকে ফিলিস্তিনি শিশুদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ। খবর আলজাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটরের।
মঙ্গলবার আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যমগুলো সরকারের মন্ত্রিসভার পরিকল্পিত ‘নীরব সংযুক্তিকরণ’ কৌশল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সপ্তাহজুড়ে গাজা ও পশ্চিম তীরে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই দেখছেন সমালোচকরা।
গাজায় নতুন বসতি ও নিয়ন্ত্রণসীমা সম্প্রসারণ
গাজায় নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে এনেছেন ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেটেলমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইতোমধ্যে গাজার উত্তরাঞ্চলে তিনটি নতুন বসতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছে।
একই সময়ে গাজার অভ্যন্তরে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণসীমা নির্দেশকারী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর পাশের সীমাচিহ্ন পশ্চিমদিকে আরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রিত এলাকা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে ইসরাইল।
‘অ্যাকসেস-রেস্ট্রিকটেড’ গাজার ৬৫ শতাংশ অংশ
জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ২৩ জুন মধ্যরাতে বেইত লাহিয়ার কাছে একটি কোয়াডকপ্টার থেকে দাহ্য গোলাবারুদ ফেলা হয়। এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের তিনটি তাঁবুতে আগুন ধরে যায়। পরে আশ্রয়শিবিরের পাশে একটি হলুদ সিমেন্ট ব্লক স্থাপন করে ইসরাইলি বাহিনী, যা নিয়ন্ত্রণসীমা আরও সম্প্রসারণের ইঙ্গিত হিসাবে উলেখ করেছে ওসিএইচএ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ওই নিয়ন্ত্রণরেখার আশপাশে প্রায় ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বর্তমানে গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা ‘অ্যাকসেস-রেস্ট্রিকটেড’ বা প্রবেশ-সীমাবদ্ধ অঞ্চলের আওতায় রয়েছে।
পশ্চিম তীরে জমি অধিগ্রহণ ও বসতি সম্প্রসারণ
দখলকৃত পশ্চিম তীরেও বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। রামাল্লাহর উত্তরের সিনজিল এলাকার কাছে ৪৬৫ দুনাম (০.৪৬৫ বর্গকিলোমিটার) জমিকে ‘রাষ্ট্রীয় জমি’ ঘোষণা করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া ওয়াফা ও স্থানীয় কর্মী নেটওয়ার্কগুলোর তথ্যে বলা হয়েছে, কোবার ও বেইতিলর এলাকার ব্যক্তিমালিকানাধীন ফিলিস্তিনি জমিতে নতুন বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আল-মাজরা আশ-শারকিয়া ও কাফর মালেকের মাঝামাঝি এলাকায় নতুন একটি আউটপোস্ট স্থাপনের জন্য জমি ঘিরে ফেলেছে দখলদার বাহিনী।
ইব্রাহিমি মসজিদে পরিবর্তন ও আজান বন্ধ
সম্প্রতি হেবরনের ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রবেশ করে খোলা প্রাঙ্গণে ইস্পাতের বিম স্থাপনের কাজ শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী। পাশাপাশি প্রায় দেড় সপ্তাহ সেখানে মুসলিমদের আজান বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। মসজিদের কর্তৃপক্ষের দাবি, এই পরিবর্তন স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় চরিত্রে মৌলিক হস্তক্ষেপ।
শিশু হত্যাকে গণহত্যার ইঙ্গিত বলছে জাতিসংঘ
২৩ জুন জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানায়, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করেছে। কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের প্রায় ৩০ শতাংশ। কমিশনের ভাষ্য, শিশুদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বসতি স্থাপনকারীদের ওপর হামলা ও সীমিত বিচারিক পদক্ষেপ
ওসিএইচএর তথ্যমতে, রামাল্লাহ অঞ্চলের দার ফাজা ও পূর্ব তাইবেহ এলাকায় নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের পর অন্তত ১১টি বসতি স্থাপনকারীর হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব হামলায় স্থানীয়দের একমাত্র পানির উৎস নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং ২০০ জনের বেশি মানুষের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তথাকথিত যুদ্ধবিরতির প্রায় নয় মাস পরও সহিংসতা থামেনি। যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী সময়ে নিহতের সংখ্যা অন্তত এক হাজার ৪৫ জনে পৌঁছেছে।
প্রিন্ট করুন




















Discussion about this post