ডেস্ক রিপোর্ট: ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র এই আকস্মিক উত্থানের পেছনের কারণগুলো বেশ গভীর ও বহুমাত্রিক। এটাকে স্রেফ ইন্টারনেটের তামাশা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন, বিশেষ করে যখন এর অনুসারী সংখ্যা ক্ষমতাসীন দলের চেয়েও দ্রুত গতিতে বেড়েছে। এই ঘটনার মূলে রয়েছে প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্য, তবে এর শিকড় ভারতের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গভীরে প্রোথিত।
১. তীব্র বেকারত্ব সংকট ও কাঠামোগত বৈপরীত্য: ভারতের গড় বেকারত্বের হার কম মনে হলেও, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা অত্যন্ত তীব্র। স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে চার গুণের বেশি এবং বিশের কোঠার শুরুতে থাকা তরুণদের প্রতি তিনজনের একজন বেকার। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণদের হতাশা সিজেপি-র প্রতি এই আকস্মিক সমর্থনের একটি বড় কারণ।
২. প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভাষা ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ: প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ‘কাল্পনিক’ দলের জন্ম। এই উদ্ভট, ব্যঙ্গাত্মক এবং ‘আত্মবিদ্রূপী’ ভাষা তরুণ সমাজের মাঝে দ্রুত আলোড়ন তৈরি করেছে। এটি ব্যবস্থার প্রতি তাদের তীব্র অনাস্থা এবং হতাশার এক ধরণের শৈল্পিক ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অনাস্থা: সম্প্রতি ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি ২০২৬’ বাতিল, প্রশ্ন ফাঁস, এবং ‘ব্যাপম’ কেলেঙ্কারি—এই ধরণের ঘটনাগুলো সফল হওয়ার প্রতিটি চেনা পথে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। এই দুর্নীতিগুলো সাধারণ মানুষের মনে ব্যবস্থার প্রতি তীব্র ও স্থায়ী অনাস্থা তৈরি করেছে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য সেই বারুদে আগুন হিসেবে কাজ করেছে।
৪. ‘বিমানবিকীকরণ’-এর প্রবণতা: মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার, বা বিভিন্ন প্রাণী বা কীটপতঙ্গের তকমা দেওয়ার নোংরা খেলা ভারতে বহু আগে থেকেই চলে আসছে। এর আগে অনুপ্রবেশকারী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এই ধরণের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ‘তেলাপোকা’ মন্তব্য এই ধারাবাহিকতার অংশ, যা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত নাগরিকদেরও ব্যবস্থার চোখে ‘বাতিলযোগ্য’ গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে।
৫. রাজনৈতিক মিম ও ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা: সিজেপি-র উত্থান ভারতের রাজনৈতিক মিম ও ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের দীর্ঘদিনের পথচলার প্রেক্ষাপট থেকে বুঝতে হবে। এটি ‘হিউম্যানস অব হিন্দুত্ব’-র মতো পেজের সাথেও মিল রাখে। সিজেপি একটি প্রাথমিক পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলন, যা রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার এবং ডিজিটালি সুসংগঠিত।
সংক্ষেপে, ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র এই আকস্মিক উত্থান তরুণ সমাজের হতাশা, ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ধরণের শান্তিপূর্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ। এটিকে স্রেফ ইন্টারনেটের তামাশা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ।
প্রিন্ট করুন



















Discussion about this post