Print Date & Time : 6 May 2026 Wednesday 1:29 am

যেভাবে স্কুলশিক্ষক থেকে কুখ্যাত যৌন অপরাধী হয়ে উঠলেন এপস্টেইন জেফরি

ডেস্ক রিপোর্ট: জেফরি এপস্টেইন একসময় ছিলেন ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী অর্থলগ্নিকারী, অভিজাত সমাজের পরিচিত মুখ। অথচ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে তিনি পরিচিত হয়ে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কুখ্যাত যৌন অপরাধী হিসেবে।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান এপস্টেইন। মৃত্যুর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি যৌন নিপীড়ক নন, বরং একজন অপরাধী; যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকে শহরের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। যদিও তিনি কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। এক শিক্ষার্থীর বাবার মাধ্যমে বিনিয়োগ ব্যাংক বিয়ার স্টার্নসের এক জ্যেষ্ঠ অংশীদারের সঙ্গে পরিচয়ের পর দ্রুতই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মাত্র চার বছরের মধ্যে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে ওঠেন।

১৯৮২ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানি গড়ে তোলেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি মূলত শতকোটি ডলারের বেশি সম্পদধারী ধনীদের অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল।

সেকারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই এপস্টেইন হয়ে ওঠেন অভিজাত সমাজের নিয়মিত অতিথি। ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে বিলাসবহুল সম্পত্তির পাশাপাশি নিউইয়র্কে শহরের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক ছিলেন তিনি।

রাজনীতিবিদ, তারকা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল নিয়মিত। ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প এপস্টেইনকে দারুণ মানুষ বলে উল্লেখ করেন। যদিও পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন, বহু বছর আগেই এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।

বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, কেভিন স্পেসি, হার্ভে ওয়াইনস্টিন; এমন বহু আলোচিত ব্যক্তির নাম উঠে আসে এপস্টেইনের সামাজিক বৃত্তে।

২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে প্রথমবার বড় ধরনের তদন্তের মুখে পড়েন এপস্টেইন। তদন্তে সামনে আসে বহু ভুক্তভোগীর বক্তব্য।

তবে ২০০৮ সালে কৌঁসুলিদের সঙ্গে এক বিতর্কিত সমঝোতার মাধ্যমে তিনি ফেডারেল মামলার হাত থেকে রেহাই পান। আজীবন কারাদণ্ডের সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মাত্র ১৮ মাসের সাজা দেওয়া হয়, যার বড় অংশই ছিল বিশেষ সুবিধাসহ।

এই সমঝোতা চুক্তিকে মায়ামি হেরাল্ড শতাব্দীর চুক্তি বলে আখ্যা দেয়। কেলেঙ্কারির জেরে ২০১৯ সালে তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী অ্যালেক্সান্ডার অ্যাকোস্টা পদত্যাগ করেন।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে যৌন পাচারের অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার হন এপস্টেইন। জামিন না মঞ্জুর হওয়ায় তাকে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারাগারে রাখা হয়। বিচার শুরু হওয়ার আগেই ১০ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। সরকারি ভাষ্যে এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ আজও রয়ে গেছে।

এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক প্রেমিকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ ছিল, তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচারে এপস্টেইনকে সহায়তা করেছিলেন।

২০২১ সালে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে গিলেন ম্যাক্সওয়েল বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচয়ই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

২০২৫ সালে এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট আইনের আওতায় লাখ লাখ পৃষ্ঠা নথি প্রকাশ করা হয়। এসব নথি এপস্টেইনের জীবন, তার যোগাযোগ এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

স্কুলশিক্ষক থেকে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে, সেখান থেকে কুখ্যাত অপরাধী; জেফরি এপস্টেইনের জীবন শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে ক্ষমতা ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার এক অন্ধকার প্রতিচ্ছবি।