ডেস্ক রিপোর্ট: তেহরানে গভীর রাতে আকাশের নিচে জড়ো হওয়া সমর্থকেরা একসঙ্গে ধ্বনি তুলছেন—“আল্লাহু আকবর।” একই সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার হচ্ছে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের দৃশ্য। তার গায়ে লেখা—‘আপনার সেবায়, সাইয়্যেদ মোজতবা।’
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণার পর এমনভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখান তার সমর্থকেরা। অনেক বিশ্লেষকের কাছে এটি শুধু নেতৃত্ব বদলের ঘটনা নয়—বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
কারণ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কার্যত বাবা থেকে ছেলের হাতে যাচ্ছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি হলেন ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দ্বিতীয় ছেলে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিলেন।
তবে তার ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপট আগের নেতাদের তুলনায় ভিন্ন। তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন এমন এক সময়, যখন ইরান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তার নেতৃত্ব কি বাবার নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি নতুন কোনো কৌশল সামনে আনবে?
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মাবনের মতে, মোজতবা খামেনির উত্থান বোঝার জন্য তার বাবার রাজনৈতিক যাত্রার সঙ্গে তুলনা করা জরুরি।
আলি খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে বহু বছর প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ইসলামি বিপ্লব ও ইরান-ইরাক যুদ্ধের অস্থির সময়েও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি সর্বোচ্চ নেতা হন।
তবে ধর্মীয় যোগ্যতার দিক থেকে তাকেও তখন সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হয়নি। তবুও রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে তাকে নির্বাচিত করা হয়েছিল বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
অন্যদিকে মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক পথ ছিল অনেকটাই নীরব ও আড়ালনির্ভর।
তিনি কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না, জনসভায় বক্তব্য দেননি বা গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দেননি। জনসমক্ষে তার খুব কম ছবি বা ভিডিও পাওয়া যায়।
কিন্তু এই নীরবতার আড়ালেই তৈরি হয়েছে তার প্রভাব। ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে উইকিলিকস প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে “ক্ষমতার আড়ালের শক্তি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন নেপথ্যে থেকে তিনি রাজনৈতিক সমন্বয় ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কাজ করেছেন। বিশেষ করে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তার সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনী এখন ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সামরিক শক্তির পাশাপাশি বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মোজতবা খামেনির সঙ্গে এই বাহিনীর সম্পর্কের শুরু অনেক আগে। ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া মোজতবা আলি খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তেহরানের আলাভি স্কুলে পড়াশোনা করার পর তিনি অল্প সময়ের জন্য সামরিক বাহিনীতে কাজ করেন এবং কিশোর বয়সেই ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ কিছু গণমাধ্যম তাকে “আয়াতুল্লাহ” বলে উল্লেখ করতে শুরু করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তার ধর্মীয় বৈধতা শক্তিশালী করতেই এমন প্রচেষ্টা চলছে।
তবে তার ক্ষমতায় আসা বিতর্কমুক্ত নয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো হয়েছিল এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম আদর্শ ছিল—নেতৃত্ব বংশানুক্রমিক হবে না।
কিন্তু মোজতবা খামেনির নিয়োগ সেই প্রশ্নই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
২০০৯ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর শুরু হওয়া “গ্রিন মুভমেন্ট” বিক্ষোভের সময় অভিযোগ ওঠে মোজতবা খামেনি সম্ভাব্য উত্তরসূরি হতে যাচ্ছে। যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদও জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতোমধ্যেই তার নিয়োগকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমে এটিকে এক ধরনের “বংশগত ধর্মতন্ত্রের” সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে বলেছেন, ইরানের যে সর্বোচ্চ নেতাই থাকুক না কেন, তিনি তাদের লক্ষ্যবস্তু।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আড়াল থেকে ক্ষমতার রাজনীতি পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে মোজতবা খামেনি ভবিষ্যতে আরও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন।
তার ক্ষমতায় আসার সময়টিও ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আলি খামেনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, কিন্তু মোজতবা দায়িত্ব নিয়েছেন চলমান সংঘাতের মধ্যেই।
ফলে অঞ্চল এবং বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার সময় মোজতবার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তার মা, স্ত্রী এবং এক ছেলের মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত এই ক্ষতিও তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলতে পারে। ফলে তার নেতৃত্বকে অনেকেই ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি শক্ত বার্তা হিসেবেই দেখছেন।
প্রিন্ট করুন




















Discussion about this post