ডেস্ক রিপোর্ট: প্যারিসের লাতিন কোয়ার্টারের ঐতিহাসিক এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা গ্র্যান্ড মসজিদ ২০২৬ সালে শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। একশ বছরের এ পথচলায় এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই যুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে লড়াই করেছিলেন বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম সৈনিকরা। উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এসব সৈনিক ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেন। তাদের অনেকেই যুদ্ধে প্রাণ হারান। তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ও স্মৃতি ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই প্যারিসে একটি বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের অনুমোদন দেয়। কয়েক বছর নির্মাণকাজ চলার পর ১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদ। উদ্বোধন করেন তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ দুমের্গ। মসজিদের প্রথম রেক্তর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সি কাদ্দুর বেংগাব্রিত।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গ্র্যান্ড মসজিদ ফ্রান্সের মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে এটি ফ্রান্সে মুসলিম ঐতিহ্য ও উপস্থিতির একটি পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়।
প্যারিসের এ মসজিদের স্থাপত্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর নকশায় আন্দালুসীয় ও মুরিশ স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব রয়েছে। ৩৩ মিটার উঁচু মিনার, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, আরবি ক্যালিগ্রাফি, মোজাইক নকশা এবং বাগানের সমন্বয়ে তৈরি এই স্থাপনা প্যারিসের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন।
একশ বছর পরও গ্র্যান্ড মসজিদের মূল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়। পাশাপাশি আরবি ভাষা শিক্ষা, ইসলামি শিক্ষা, ধর্মীয় আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শুক্রবারের জুমার নামাজ, রমজান ও ঈদের সময় মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়।
গ্র্যান্ড মসজিদের পরিচালনা ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ফরাসি সরকার কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ করে না। গ্র্যান্ড মসজিদও সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বর্তমানে এর রেক্তর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেমস এদ্দিন হাফিজ।
২০২৬ সালে শতবর্ষ উপলক্ষে গ্র্যান্ড মসজিদে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, পুরোনো ছবি ও দলিল উপস্থাপন, ইসলামি শিল্প ও সংস্কৃতির আয়োজন এবং আলোচনা সভা। এসব আয়োজনের মাধ্যমে একশ বছরের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।
শতবর্ষের এ আয়োজনে ফ্রান্সের সরকারি প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, কূটনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ, মন্ত্রী অরোর বেরজে, প্যারিস পুলিশের প্রিফেক্ট পাত্রিস ফোর, প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার, ইল দ্য ফ্রঁস অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ভালেরি পেক্রেসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
গ্র্যান্ড মসজিদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি মানবিক অধ্যায়ও আলোচিত। বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নাৎসি দখলদারিত্বের সময় তৎকালীন রেক্তর সি কাদ্দুর বেংগাব্রিতের নেতৃত্বে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কিছু নির্যাতিত মানুষকে সহায়তা করেছিলেন। তবে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।
ফরাসি ইতিহাসবিদ বেনজামিন স্তোরা গ্র্যান্ড মসজিদকে ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখেন।
একশ বছর আগে যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যে মসজিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা ফ্রান্সের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই গ্র্যান্ড মসজিদ এখন ফ্রান্সের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে সংরক্ষিত আছে আত্মত্যাগ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সহাবস্থানের এক দীর্ঘ ইতিহাস।