ডেস্ক রিপোর্ট: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দিনের ঐতিহাসিক ইসরাইল সফর শেষ হয়েছে। এই সফরে তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। তবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বাহিনীর চলমান সামরিক অভিযান বা গণহত্যার বিষয়ে মোদির নীরবতা এবং নেতানিয়াহুর প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইসরাইলের প্রতি মোদির দৃঢ় সমর্থন এবার ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট। বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া ভাষণে মোদি ঘোষণা করেন, ভারত ইসরাইলের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘বর্বর’ বলে অভিহিত করেন এবং ভারতের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানান। তবে এই ভাষণে তিনি গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি বা চলমান মানবিক সংকটের বিষয়ে কোনো সরাসরি উল্লেখ করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই অবস্থান ভারতের দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিনপন্থি পররাষ্ট্রনীতি থেকে একটি বড় বিচ্যুতি।
মোদি তার ভাষণে ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে ‘সভ্যতাগত সম্পর্কের’ ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি দুই দেশের ঐতিহ্যকে প্রাচীন এবং তাদের দার্শনিক চিন্তাধারাকে সমান্তরাল বলে অভিহিত করেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মোদির দল বিজেপি এবং ইসরাইলের জায়নবাদী আদর্শের মধ্যে একটি কাঠামোগত মিল রয়েছে। উভয় পক্ষই নিজ নিজ রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ‘প্রাকৃতিক জন্মভূমি’ হিসেবে গড়ে তোলার অভিন্ন লক্ষ্য পোষণ করে। মোদি এমনকি মজা করে বলেন যে, ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভারত যখন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়, সেই দিনেই তার জন্ম হয়েছিল।
বর্তমানে ভারত ইসরাইলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। গাজা যুদ্ধের মধ্যেও ভারতের বেশ কিছু অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইসরাইলকে রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে বলে জানা যায়। এই সফরে দুই নেতা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে ‘ক্রিটিক্যাল অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজিস পার্টনারশিপ’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং খনিজ সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দুই দেশ এখন একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চালাচ্ছে।
ইসরাইল, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত ‘I2U2’ জোটে ভারত অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের গুরুত্বও এই সফরে আলোচিত হয়েছে। নেতানিয়াহু ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘ষড়ভুজ জোট’ গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। ভারত এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের দ্বন্দ্বে জড়াতে চায় না, বরং তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
মোদি সরকার ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুকে আলাদাভাবে দেখার বা ‘ডি-হাইফেনেশন’ নীতি গ্রহণ করেছে। এর অর্থ হলো, ফিলিস্তিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তা বাধা হবে না। ভারতের অনেক শ্রমিক এখন ইসরাইলে কাজ করতে যাচ্ছেন এবং অনেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত সৈনিক ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন। তবে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম জাতিসংঘ কর্মী কর্নেল বৈভব কালের মৃত্যু নিয়ে মোদি কোনো মন্তব্য করেননি। ভারতের এই নতুন কৌশল ইঙ্গিত দেয় যে, নয়াদিল্লি এখন ফিলিস্তিন ইস্যুর চেয়ে ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
খবর : বিবিসি।