ডেস্ক রিপোর্ট: হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের পাশাপাশি ওমানেও বোমা হামলা চালাতে চান তিনি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্ততা করতে থাকা দেশটির ওপর হঠাৎ কেন ক্ষুব্দ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির পথে ওমান ‘বাধা হয়ে দাঁড়ালে’ তবেই সেখানে বোমা হামলা চালাবেন। মূলত ওমান ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে। ইরান আবার স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবে না। এখানেই সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের।
সোমবার (১৭ আগস্ট) মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি গোপন চ্যানেল তৈরি করেছে। তবে আইআরজিসি ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে।
ওমানের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ওমান যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা তাদের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করব।
আইআরজিসির এক মুখপাত্র ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজকে বলেন, আমেরিকানদের সঙ্গে আইআরজিসির কোনো আলোচনা হচ্ছে না। ট্রাম্পের এই বক্তব্য ‘পরাজয় ও যুদ্ধের হতাশা থেকে সৃষ্ট কল্পনা।’
আগেও ওমানকে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প
ওমানে বোমা হামলা চালানোর হুমকি এবারই প্রথম নয়। গত মে মাসেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানকে একই ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ২৭ মে এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইরান ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করলে তিনি তা মেনে নেবেন কি না।
জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, কেউ হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করবে না। ওমান অন্য সবার মতো আচরণ করবে, না হলে তাদের উড়িয়ে দিতে হবে। পরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও ট্রাম্পের বক্তব্যের লিখিত প্রতিলিপি প্রকাশ করে, যেখানে ‘ওমান’-এর নামই উল্লেখ ছিল।
কেন হরমুজ নিয়ে এত উত্তেজনা?
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও ওমান সরাসরি আলোচনা করছে, কাতারের মধ্যস্থতায় তারা হরমুজ প্রণালিতে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছে।
সোমবার ইরান জানিয়েছে, দুই দেশ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন রুট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং এখন যৌথ ঘোষণা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো ইরান ও ওমানের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমাতে বা শেষ করতে হবে। কিন্তু ইরান ও ওমানের সম্ভাব্য চুক্তি সেই নিয়ন্ত্রণকে আরও বৈধতা দিতে পারে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
গালফ স্টাডিজের অধ্যাপক লালেহ খলিলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে ইরান ও ওমান যদি নিজেরাই হরমুজের জাহাজ চলাচল পরিচালনার ব্যবস্থা করে, তাহলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবহীনতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসবে।
হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত।
ইরান মার্চের শুরুতে প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় এবং কেবল নিজেদের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়। ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল।
তবে সেই সমঝোতা পরে ভেঙে পড়ে। এরপর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে এবং ওমানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজের আশপাশে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র একটি পানামার পতাকাবাহী কার্গো জাহাজে গুলি চালানোর কথাও জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, জাহাজটি ইরানি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল এবং মার্কিন নির্দেশ মানেনি।
তেলের দামও বেড়েছে
হরমুজ সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৬ ডলার। যুদ্ধ চলাকালে দাম কয়েকবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং মার্চে সর্বোচ্চ প্রায় ১১৯ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ৯১.২২ ডলার হয়েছে, যা প্রায় তিন সপ্তাহের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি।
ওমানের অবস্থান কী?
ওমান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ওমানের মধ্যে প্রায় ২০০ বছরের সম্পর্ক রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন চুক্তি রয়েছে। যুদ্ধের সময় ইরান ওমানসহ আশপাশের কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এরপরও ওমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।