Print Date & Time : 17 June 2026 Wednesday 1:08 am

ইরান চুক্তিতে বেকায়দায় নেতানিয়াহু

ডেস্ক রিপোর্ট: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সোমবার ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁর সঙ্গে আলোচনার সময় ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।

মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো— জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের দিন, অর্থাৎ শুক্রবার থেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।

তবে এই চুক্তি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের তিনটি মৌলিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে এবং তাকে নতুন এক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে— যিনি নিজেকে ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রভাবশালী কৌশলগত অংশীদার এবং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাল? আরও বড় প্রশ্ন হলো— কেন তার প্রধান মিত্রই এমন একটি পদক্ষেপ নিল যা কার্যত তাকে অস্বস্তিকর অবস্থানে ফেলে দিয়েছে?

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরাইলের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এই সংঘাত-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।

এর পাশাপাশি, লেবাননে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের পক্ষ থেকে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নেতানিয়াহুর বহুদিনের গড়ে তোলা ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তির ওপরও বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই পরিস্থিতি তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিব্রতকর।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন কার্যত কোনো সহজ সমাধান নেই।

সোমবার ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ মন্তব্য করেন, ‘তার সামনে এখন মাত্র দুটি পথ খোলা আছে— হয় আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গে সরাসরি ও গভীর সংঘাতে জড়ানো, নয়তো ইসরাইলের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া।’

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে বলেন যে, রোববার বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইসরাইলের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং গণমাধ্যমের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে। অক্টোবরের নির্বাচনের আগে তারা বিষয়টিকে জোরালোভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

শুধু বিরোধীরাই নয়, নেতানিয়াহুর নিজ দল লিকুদ পার্টি এবং জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের মধ্যেও অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে তেহরানের এই দাবি যে, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে— তা ইসরাইলের ডানপন্থী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। আমরা এমন কোনো চুক্তির অংশ নই, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।’

মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইনও চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তার ভাষায়, ‘আমেরিকানরা কেন এই শর্ত মেনে নিল, তা বোঝা কঠিন।’

তিনি আরও বলেন, ‘লেবাননের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইরানকে প্রভাবশালী অবস্থান দেওয়ার অর্থ হলো হিজবুল্লাহকে সহায়তা অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি করা এবং লেবাননের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ধরে রাখতে সহায়তা করা।’

এদিকে নেতানিয়াহু নিজেও এখন অনেকটাই নীরব।

সাধারণত নিজেকে বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে অভ্যস্ত এই নেতার নীরবতাকে বিশ্লেষকরা তার বর্তমান সংকটেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

গাজায় হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করা— অর্থাৎ হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তা নির্মূল করার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

ইসরাইলি বাহিনী গাজার বিশাল অংশ ধ্বংস করে এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পরও হামাস এখনও প্রায় অর্ধেক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে।

অন্যদিকে, আট মাস আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি উদ্যোগ এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

নেতানিয়াহুর নতুন নিরাপত্তা কৌশল ইসরাইলি বাহিনীকে গাজা, লেবানন এবং সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বজায় রাখতে বাধ্য করেছে।

যদিও দেশের অনেক নাগরিক এই নীতিকে সমর্থন করেন, তবুও এর পেছনে কার্যকর কোনো কূটনৈতিক রূপরেখা এখনো দৃশ্যমান নয়।

একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইসরাইলের সামরিক সম্পদ ও রিজার্ভ বাহিনীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।
ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালিয়েও ইসরাইল তার প্রধান প্রতিপক্ষদের পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি।

বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাত ইরানের অভ্যন্তরে আরও কঠোরপন্থী নেতৃত্বের উত্থানকে উৎসাহিত করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কৌশলগত প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো— এখন এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, ইসরাইলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান পরোক্ষভাবে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, ‘এই পরিস্থিতি ইসরাইলের ইরান-কেন্দ্রিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তুলেছে। তাদের আরও বাস্তববাদী ও সংযত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।’

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘ওয়াশিংটন যদি মনে করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ এই চুক্তিকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর হতে পারে।’

সিট্রিনোভিচ আরও উল্লেখ করেন, ‘ওবামা প্রশাসনের সময় নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেস ও মার্কিন জনমতকে কাজে লাগাতেন, বর্তমান বাস্তবতায় সেই পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’

দীর্ঘদিন ধরেই নেতানিয়াহু দাবি করে আসছেন যে, তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা নীতি আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় ইসরাইলের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে হয়তো তার এই রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতো।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা।

ফলে আজ নেতানিয়াহু এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে তাকে কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়, বরং তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গেই সংঘাত কিংবা আপসের কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি বেছে নিতে হতে পারে।

খবর : বিবিসি