Print Date & Time : 22 May 2026 Friday 2:41 am

ইরানের নতুন অস্ত্র এখন সাবমেরিন কেব্​ল

ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সামরিক হামলা চালানো, ক্ষতিকর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আর মিত্রদের সঙ্গে মিলে নিজের সীমানার বাইরে পর্যন্ত প্রভাব খাটানো—এসব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এক বিশাল শক্তি আছে। শুধু রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বেসরকারি কোম্পানি, বিদেশি সরকার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করেও তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এমন ক্ষমতার সমাহার খুব কম দেশেরই আছে।

কিন্তু এই শক্তি ধরে রাখা সহজ নয়। কারণ, এই ক্ষমতা টিকে আছে একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ব্যবস্থার ওপর। সামরিক শক্তি ব্যবহার মানে রক্তপাত, বিপুল অর্থ খরচ এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া। শুল্ক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিলে অন্য দেশগুলো বিকল্প বাণিজ্য ও লেনদেনের পথ খুঁজতে শুরু করে। আবার মিত্রদের সঙ্গে জোটও সব সময় মসৃণ থাকে না; দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়াতে পারে। কিন্তু এতে সেই বৈশ্বিক ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা দাঁড়িয়ে আছে।

ইরানের অবস্থা একেবারে আলাদা। তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সীমিত, মিত্রও কম। কিন্তু তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে তারা অন্যদের ওপর খরচের বোঝা চাপিয়ে নিজে লাভ করতে পারে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি আগে থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায়ের চেষ্টা করেছে, যেন এই পথই আয় করার উৎস হয়। এখন ইরানের কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম একই অঞ্চলের সমুদ্রতলের ডেটা কেব্‌ল বা সাবমেরিন কেব্‌লগুলোর ওপরও ফি বসানোর কথা বলছে।

এটা শুধু ডেটার প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি নয়, বরং প্রযুক্তি খাতের একটি বড় দুর্বল জায়গায় আঘাত। অ্যামাজন, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট—এই বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাদের ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার পুরোপুরি নির্ভর করে সাবমেরিন কেব্‌ল সংযোগের ওপর। ইরান এখন ভূগোলকে শুধু একটি সংকীর্ণ পথ হিসেবে নয়, বরং আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজকে চাপে ফেলা যায়। একইভাবে এখন কেব্‌লের মালিক, ক্লাউড সেবাদাতা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও চাপে ফেলতে চায় তারা।

সাবমেরিন কেব্‌লগুলোর মানচিত্র দেখলে বোঝা যায়, বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের কাছাকাছি থাকা ফ্যালকন, গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল-মধ্যপ্রাচ্য-উত্তর আফ্রিকা, কুয়েত-ইরান ও ইউএই-ইরান কেব্‌লগুলো পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। ফলে এই ডিজিটাল অবকাঠামোও এখন সেই একই উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় রয়েছে, যেখানে জাহাজ চলাচল ও নৌ টহল হয়।

ডেটা যেখানে ব্যবহার করা হয়, সেখানে কর বসানো যায় না। কিন্তু যেখান দিয়ে ডেটা চলাচল করে, সেই পথ যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তখন সেখানেই চাপ তৈরি করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কোম্পানি ঝুঁকিতে থাকলেও তাদের অফিস বা শহর তাদের আসল দুর্বল জায়গা নয়। তাদের আসল দুর্বলতা হলো সমুদ্রের নিচের কেব্‌ল যেগুলো বিভিন্ন দেশের জলসীমা আর সরু সমুদ্রপথগুলোয় বিছানো আছে। এই জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই রাষ্ট্রগুলো অনুমতি দিয়ে বা আটকে রেখে প্রভাব খাটাতে পারে।

ইরান ঠিক এ জায়গাকেই কাজে লাগাতে চাইছে। সহজভাবে বললে—লাভটা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে, কিন্তু দুর্বল জায়গাটা নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। আর সেই জায়গাগুলো ধরেই চাপ তৈরি করা সম্ভব।

এ ধরনের ক্ষমতা আগের যুগের থেকে আলাদা। আগে শক্তি মানে ছিল তেল, খনিজ, জমি বা বন্দর নিজের দখলে রাখা। এখন ইরান দেখাচ্ছে, এসবের মালিক না হয়েও সুবিধা নেওয়া যায়। এর জন্য শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ন্ত্রণ বা হুমকি তৈরি করতে পারলেই যথেষ্ট।

সমুদ্রতলের কেব্‌ল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল দুনিয়াও আসলে খুব বাস্তব অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। ‘ক্লাউড’ কোনো ভাসমান জিনিস নয়, এর ভিত্তি সমুদ্রের নিচে। ডেটা চলাচল নির্ভর করে নির্দিষ্ট ল্যান্ডিং স্টেশন, মেরামতের জাহাজ, লাইসেন্স, মালিকানা এবং নিরাপত্তার ওপর। এ কারণে কেব্‌লগুলো আধুনিক সংঘাতে সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। এর সামান্য ক্ষতিও বড় অর্থনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালিকে এখন আর শুধু খোলা বা বন্ধ—এভাবে দেখা ঠিক হবে না। সেখানে কিছু জাহাজ চলাচল করছে। তবে অনেক সময় সেগুলো চলছে ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ চলাচল এখন আর স্বাভাবিক অধিকার নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ সুবিধা।

সাবমেরিন কেব্‌ল নিয়েও ইরান একই কৌশল প্রয়োগ করতে চাইছে। এর জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে হবে না বা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও ডেটার প্রবাহ বন্ধ করতে হবে না। শুধু এতটাই দরকার—এই প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করা, যাতে নিরাপত্তারও একটা মূল্য দাঁড়িয়ে যায়।

ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত শুরুতেই এই ফি আরোপের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করবে, যাতে এটি গ্রহণযোগ্যতা না পায়। তারা বিমা কোম্পানি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে আগেই পরিস্থিতি সামলাতে চাইবে। একই সঙ্গে তারা নিশ্চিত করতে চাইবে, কেব্‌ল মেরামতের কাজ যেন কোনোভাবে আটকে না পড়ে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কেব্‌ল রুট, নতুন ল্যান্ডিং পয়েন্ট এবং মেরামতব্যবস্থার উন্নতি করে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে পারে। উদ্দেশ্য শুধু হরমুজ খোলা রাখা নয়, বরং অনিরাপত্তা থেকে লাভ করার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া।

সাবমেরিন কেব্‌লে ফি বসানোর কথা ইরান বলছে ঠিকই, কিন্তু এটা পুরোপুরি বাস্তবে হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে এতে বোঝা যায়, ইরান কী করতে চাইছে।

সাধারণভাবে যখন কোনো দেশ চাপ দেয়, তখন তারও খরচ হয়। কিন্তু ইরান এমন একটা উপায় খুঁজছে, যেখানে সে অন্যদের ওপর চাপ দেবে, আবার সেখান থেকেই টাকা আয়ও করবে।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তি না হয়েও নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইরান চাইছে, বিশ্ব যেন ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে তার জন্য একটা ‘মূল্য’ দেয়।