ডেস্ক রিপোর্ট: আন্তর্জাতিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের একসময়কার বৈচিত্র্যময় ও সক্রিয় গণমাধ্যমখাত কার্যত ভেঙে পড়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সেন্সরশিপের চাপে শত শত গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মহীন হয়েছেন হাজারো সাংবাদিক। এই শূন্যতার সুযোগেই আফগানিস্তানে দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
২০২১ সালের পর থেকে আফগানিস্তানে চীনের মিডিয়া উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টিএর সঙ্গে কথা বলা একাধিক আফগান সাংবাদিক জানিয়েছেন, চীনা গণমাধ্যমগুলো মূলত এমন সব সংবাদ ও ডকুমেন্টারি তৈরি করছে, যা বেইজিংয়ের ‘ইতিবাচক ভূমিকা’ তুলে ধরে; অথচ দারিদ্র্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দমন-পীড়ন কিংবা সাধারণ মানুষের দুর্দশার মতো বিষয়গুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।
কাবুলে কর্মরত এক আফগান সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের বলা হয় কেবল ইতিবাচক বিষয় নিয়ে কাজ করতে—যাতে তালেবান সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। মাঠে গেলে আমরা ক্ষুধা ও কষ্ট দেখি, কিন্তু সেসব গল্প প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। বাস্তবতাকে আড়াল করা হচ্ছে।’
চীনা গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের অন্য মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, নির্দেশ অমান্য করলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তালেবান ক্ষমতার আগে চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) ও চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক (সিজিটিএন)-এর আফগান কর্মীরা জানান, সে সময় চীনা কনটেন্টে আগের আফগান সরকারের দুর্বলতা, দুর্নীতি ও অস্থিরতার দিকগুলো জোর দিয়ে তুলে ধরা হতো—যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে সহায়তা করত।
তালেবান শাসনের পর সেই কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে চীনা গণমাধ্যমগুলো আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, বিশেষ করে আফগানিস্তান–পাকিস্তান উত্তেজনা নিয়ে।
একই সঙ্গে তালেবান নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম—যেমন বাখতার নিউজ এজেন্সির সঙ্গে যৌথ অনুষ্ঠান, কনটেন্ট আদান-প্রদান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের বৃহত্তর ‘সফট পাওয়ার’ কৌশলের অংশ। পশ্চিমা গণমাধ্যম ও দাতা সংস্থাগুলো আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে চীন নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেখছে।
জার্মানির লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হযরত বাহার বলেন, ‘বিদেশি গণমাধ্যমে বিনিয়োগ অনেক সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যেই করা হয়। আফগান মিডিয়ার পতনের পর চীন এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বেসরকারি আফগান টিভি চ্যানেল ও মিডিয়া হাউস চীনা অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছে। চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনালের (সিআরআই) পশতু সার্ভিস কাবুল ও কান্দাহারে নিয়মিত সম্প্রচার চালাচ্ছে এবং সামাজিক মাধ্যমে বিপুল অনুসারী তৈরি করেছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ও সিজিটিএন কাবুলে অফিস চালু রেখে ইংরেজি ভাষার কনটেন্ট তৈরি করছে।
ভারতের থিঙ্ক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস (সিএসইপি)-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন অর্থায়ন, কনটেন্ট অংশীদারত্ব এবং সাংবাদিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আফগান গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। লক্ষ্য একটাই—চীনকে একটি ‘স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরা।
তবে সাবেক আফগান সরকারের শেষ চীনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত জাওয়েদ কাইম মনে করেন, চীনের ভূমিকা এখনো মূলত বাস্তববাদী।
তার ভাষায়, ‘আফগানিস্তান চীনের কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে নিরাপত্তার দিক থেকে এটি আঞ্চলিক কৌশলের অংশ। চীন চায়, আফগানিস্তান থেকে কোনো হুমকি যেন তাদের সীমান্তে না আসে।’
এই অবস্থার বিপরীতে আফগানিস্তানের স্বাধীন গণমাধ্যম খাত ক্রমেই অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। বহু সাংবাদিক দেশ ছেড়েছেন, অসংখ্য গণমাধ্যম বন্ধের মুখে।
পশ্চিমা সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়া, তালেবানের কঠোর সেন্সরশিপ, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নিষিদ্ধকরণ এবং নারী সাংবাদিকদের ওপর বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে আফগান গণমাধ্যম এক গভীর অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে।
প্রিন্ট করুন




















Discussion about this post